মাওয়া পদ্মা সেতু এলাকা থেকে কোটি টাকার বান্ডেল উদ্ধারকে কেন্দ্র করে চলছে তীব্র রহস্য ও গুঞ্জন

রুবেল তাহমিদ, মাওয়া মুন্সিগঞ্জ থেকে। 

মাওয়া পদ্মা সেতুর এলাকা থেকে কোটি টাকার বান্ডেল উদ্ধারকে কেন্দ্র করে চলছে তীব্র রহস্য ও গুঞ্জন। এক সপ্তাহের আলোচনার পর অবশেষে পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা টাকাগুলো আসল নয়,জালও নয়, এগুলো খেলনা টাকা’। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীদের দাবি, উদ্ধারকালে টাকার উপরে কোথাও “খেলনা টাকা” লেখা ছিল না। ফলে ঘটনাটি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক সন্দেহ ও নানা প্রশ্ন।

গত ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার উত্তর মেদিনী মন্ডল এলাকায় পদ্মা সেতুর সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে এক যুবককে সন্দেহ জনকভাবে বসে থাকতে দেখেন ইউসুফের কলা বাগানে। ইউসুফ  নিজেই”
ধারণা করে তারা দীর্ঘদিন ধরে কলা চুরি করে আসছে   বেশ কজন  যুবক –ইউসুফ দৌড়ে গিয়ে তাদের ধরে ফেলেন।
এসময় যুবক হাতে থাকা ভারী ব্যাগ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ব্যাগ খুলে গেলে বেরিয়ে আসে কাড়ি কাড়ি এক হাজার টাকার বান্ডেল।
ইউসুফ তার পুত্র এসআই মনির হোসেনকে ফোনে ঘটনাটি জানান। মনির হোসেন ৯৯৯-এ কল দিতে বলেন। খবর পেয়ে পদ্মা সেতু উত্তর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে টাকার ব্যাগটি জব্দ করে নিয়ে যায়। সাক্ষী হিসেবে ইউসুফ ও ইঞ্জিনিয়ার কাঞ্চনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারা জানান, ব্যাগে কোটি টাকার বেশি এক হাজার টাকার নতুন নোট ছিল দুই ধরনের নোটের বান্ডেল ।
তবে থানায় নেওয়ার পর তাদের একটি কাগজে সাক্ষর করানো হয়, কিন্তু কোথাও কত টাকা বা কয়টি বান্ডেল ছিল তা উল্লেখ করা হয়নি।
এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর  স্থানীয় সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামলে পদ্মা সেতু উত্তর থানার ওসি রুবেল হাওলাদার পিপিএম জানান, উদ্ধার করা টাকাগুলো আসল বা জাল নয়, বরং খেলনা টাকা। তার ভাষায়,টাকাগুলোর উপরে লাল কালি দিয়ে ‘খেলনা টাকার নমুনা’ লেখা ছিল। তাই বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব না দিয়ে কোনো জিডি বা জব্দ তালিকা করিনি।”
পরে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে থানার আলমারিতে রাখা টাকাগুলো দেখান তিনি। দেখা যায়, দুই ধরনের // এক হাজার টাকার নোট -যার মধ্যে কিছু নোটের সাদা অংশে স্পষ্ট লাল অক্ষরে লেখা রয়েছে-খেলনা টাকা।
তবে ইঞ্জিনিয়ার কাঞ্চন ও ইউসুফের দাবি, উদ্ধারকৃত টাকায় এমন কোনো লেখা ছিল না। টাকাগুলো নতুন ও চকচকে ছিল, দেখতে অনেকটা আসল নোটের মতো। তাদের মতে, থানায় পৌঁছানোর পর টাকাগুলোর চেহারা ও ধরন বদলে গেছে বলেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশের পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
প্রশ্ন একের পর এক: পুলিশের গাফিলতি নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা?
কেন উদ্ধারকৃত টাকাগুলো গোনা হলো না? কোটি টাকার বেশি বান্ডেল হলে তা গণনা বা তালিকাভুক্ত করা ছিল বাধ্যতামূলক। অথচ থানায় কোনো পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
কেন সাক্ষীদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর করানো হলো? ইউসুফ ও ইঞ্জিনিয়ার কাঞ্চনের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তারা একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিয়েছেন—যেখানে টাকার পরিমাণ বা জব্দের বিবরণ ছিল না। এটি আইনগতভাবে অনিয়ম ও তদন্তে গাফিলতির ইঙ্গিত বহন করে।
 যদি টাকা খেলনা হয়, তবে কেন অভিযুক্তরা পালাল? খেলনা টাকায় কেউ জীবন ঝুঁকিতে দৌড় দেয় না। বিষয়টি অন্যকিছু ইঙ্গিত করে—যা তদন্তের দাবি রাখে।
সংরক্ষিত এলাকায় খেলনা টাকা কীভাবে এল? পদ্মা সেতুর মতো দেশের সবচেয়ে কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তা এলাকায় কেউ টাকার ব্যাগ নিয়ে ঢুকলো—এমন ঘটনা প্রশাসনিক ত্রুটির চেয়ে অনেক বড় বিষয়।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া: “খেলনা টাকার আড়ালে আসল টাকার গন্ধ”
স্থানীয়রা বলছেন,
যেদিন টাকা উদ্ধার হয়, সেদিন সবাই আসল টাকাই দেখেছে। পুলিশের হাতে যাওয়ার পর সব বদলে গেল। এখন বলে খেলনা টাকা! বিষয়টি স্পষ্ট নয়, বরং সন্দেহ আরও বাড়ছে।”
কেউ কেউ মনে করছেন, উদ্ধারকৃত টাকাগুলো আসল বা জাল—যাই হোক, তা তদন্তের আগেই ‘খেলনা’ বলে দায় এড়ানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মত: পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন:
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন— পদ্মা সেতু দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা। সেখানে এমন রহস্যজনক ঘটনার অর্থ, নিরাপত্তা বলয় এখনও দুর্বল।
সংরক্ষিত এলাকায় টাকা ভর্তি ব্যাগ কেউ রেখে যেতে পারে, এটা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতারই প্রমাণ। তদন্ত না করে ‘খেলনা টাকা’ বলাটা দায়িত্বজ্ঞানহীন।”
অনুসন্ধানের উপসংহার: রহস্য এখনো ঘনীভূত
ঘটনার ছয় দিন পর হঠাৎ “খেলনা টাকা” ব্যাখ্যাপ্রশ্নের উত্তর নয়, বরং রহস্য আরও গভীর করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, “খেলনা টাকার লাল লেখা” পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছে কি না, সেটিই এখন অনুসন্ধানের মূল বিষয়।
পদ্মা সেতুর মতো সংরক্ষিত এলাকায় এই ধরণের ঘটনাকে “তুচ্ছ” বলাটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছাড়া কিছু নয়। স্থানীয়দের দাবি উদ্ধারকৃত টাকার ফরেনসিক পরীক্ষা, পুলিশি গাফিলতির স্বাধীন তদন্ত,  এবং নিরাপত্তা জোনে প্রবেশব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।পদ্মা সেতুর সংরক্ষিত এলাকা থেকে পাওয়া কোটি টাকার বান্ডেল” এখন শুধু টাকা নয় এটি প্রশাসনের জবাবদিহি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তবতা ও সত্য অনুসন্ধানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আসল, জাল না কি খেলনা এ প্রশ্নের উত্তর যতদিন না প্রকাশ্যে আসে, ততদিন ‘খেলনা টাকার আড়ালে’ গাঢ় রহস্যই থেকে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *