শফিউল বারী রাসেল:
ভূমিকা
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি আদর্শনির্ভর স্লোগান ও মতাদর্শের প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম—বিশেষত জেন-জি (Gen-Z) এবং মিলেনিয়ালরা—প্রচলিত রাজনৈতিক আদর্শে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বরং তারা চাইছে বাস্তবসম্মত সমাধান, মানসম্মত শিক্ষা, চাকরির সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা হয়ে উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক আদর্শের সংকট ও নতুন বাস্তবতা
রাজনীতির ইতিহাসে আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একসময় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র কিংবা জাতীয়তাবাদ ছিল মানুষের আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আদর্শিক বিভাজন তরুণদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
-
ব্র্যাকের ২০২৩ সালের জরিপে দেখা যায়, ৬৮% তরুণ মনে করে রাজনীতির প্রতি অনীহার প্রধান কারণ হলো বাস্তব সমস্যার সমাধান না পাওয়া (BRAC Youth Survey, 2023)।
-
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (BBS) জানায়, দেশে ২০২৪ সালে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৯.৩%, যার বড় অংশ তরুণ (BBS Labour Force Survey, 2024)।
তরুণরা তাই বলছে—“আদর্শ নয়, চাই বাস্তব সমাধান।”
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রজন্মগত ফাঁক
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। জেন-জি প্রজন্ম সেই আন্দোলনে মূল ভূমিকা রাখলেও, প্রচলিত রাজনৈতিক আদর্শবাদীরা তরুণদের ‘অগোছালো’ বা ‘আদর্শহীন’ বলে সমালোচনা করেন। অথচ আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও দেখা যাচ্ছে—
-
Pew Research Center (2022) রিপোর্টে বলা হয়েছে, জেন-জি প্রজন্ম বেশি ঝুঁকে থাকে বাস্তব নীতি ও সামাজিক সমাধানের দিকে, আদর্শনির্ভর রাজনীতির দিকে নয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশে গণমাধ্যম অনেকাংশে দলীয়করণে নিমজ্জিত। ফলে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।
-
রয়টার্স ইনস্টিটিউট ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৩ অনুসারে, বাংলাদেশে মাত্র ৩২% মানুষ সংবাদমাধ্যমকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে।
-
আবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতি রোধে কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে (TIB Annual Report, 2022)।
এর মানে হলো, দলীয়করণ এড়িয়ে গণমাধ্যম যদি বস্তুনিষ্ঠ, অনুসন্ধানী ও তরুণবান্ধব হয়, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
ভালো সাংবাদিকতার ইতিবাচক প্রভাব
-
দুর্নীতি উন্মোচন: সাংবাদিকতার রিপোর্টের কারণেই ব্যাংক খাতের কিছু অনিয়ম সামনে এসেছে (The Daily Star Investigative Report, 2021)।
-
মানবাধিকার সুরক্ষা: অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে নিখোঁজ ইস্যু নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে চাপ সৃষ্টি হয়েছে (Amnesty International, 2022)।
-
জবাবদিহিতা: সাংবাদিকদের রিপোর্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য যাচাই করে জনমনে আস্থা তৈরি করে।
নতুন প্রজন্মের বাস্তব চাহিদা
তরুণ সমাজের প্রত্যাশা আদর্শমুক্ত হলেও একেবারেই স্পষ্ট।
১. শিক্ষা সংস্কার – UNESCO Education Report (2023) অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে ৪২% কর্মবাজারে অপ্রস্তুত।
২. কর্মসংস্থান – ILO (2023) বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তরুণ বেকারত্বের হার সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে।
৩. স্বাস্থ্যসেবা – WHO (2022) জানায়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক-রোগী অনুপাত ১:১০০০ এরও বেশি।
৪. দুর্নীতি দমন – TIB-এর মতে, ২০২৩ সালে ৭১% নাগরিক মনে করে ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া যায় না।
৫. প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন – বাংলাদেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু নীতি সহায়তা কম (LightCastle Partners Startup Ecosystem Report, 2022)।
৬. পরিবেশ সুরক্ষা – Global Climate Risk Index (2023)-এ বাংলাদেশ ৭ম সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত।
পোস্ট-আইডিওলজি রাজনীতি: এক নতুন ভাষ্য
বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো অনেক আগেই ‘পোস্ট-আইডিওলজি’ বা প্রায়োগিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে।
-
সিঙ্গাপুর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক নীতি নিয়ে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
-
নর্ডিক দেশগুলো কল্যাণভিত্তিক নীতি দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী সমাজ তৈরি করেছে (World Happiness Report, 2023)।
বাংলাদেশেও যদি গণমাধ্যম তরুণবান্ধব নীতি আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করে, তবে রাজনীতিকদের বাধ্য হয়ে একই পথে হাঁটতে হবে।
গণমাধ্যমের করণীয়
১. বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন – তথ্য যাচাই ও ডেটাভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশ।
২. তরুণবান্ধব কনটেন্ট – শিক্ষা, স্টার্টআপ, ক্যারিয়ার গাইডলাইন।
৩. অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা – দুর্নীতি ও নীতি ব্যর্থতা উন্মোচন।
৪. গণআলোচনা তৈরি – টকশো, ফিচার ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বহুমত।
৫. নীতিমুখী সাংবাদিকতা – সরকারের নীতি তরুণদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে তা বিশ্লেষণ।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনীতি পরিবর্তন করতে হলে গণমাধ্যমকে আদর্শনির্ভর ফ্যান্টাসি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব চাহিদাকে সামনে আনা ছাড়া কোনো পথ নেই। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতি দমন ও প্রযুক্তি—এসব প্রশ্নকে প্রাধান্য দিয়ে যদি গণমাধ্যম তার ভূমিকা রাখে, তবে রাজনীতিকরা বাধ্য হবেন জবাবদিহিমূলক হতে।
সবচেয়ে বড় আদর্শ হলো তরুণদের নিজের সন্তান মনে করা। গণমাধ্যম যদি এই বার্তা তুলে ধরে, তবে আদর্শহীনতার মধ্য দিয়েই তৈরি হবে নতুন এক আদর্শ—বাস্তবমুখী, তরুণবান্ধব ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতি।
লেখক: (সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক)
