জামায়াতের মেটিকুলাস ডিজাইন এবং ভাইরাল লোগোর স্পাইরাল ব্র্যান্ডিং

এফ শাহজাহান:
যুদ্ধে জেতার জাদুকর এবং বিশ্বের বড় বড় সামরিক বাহিনীর গুরু ‘সান জু’ ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’-গ্রন্থে বলেছেন, “বিজয়ী যোদ্ধারা যুদ্ধে যাওয়ার আগেই জয়ী হয়, আর পরাজিতরা যুদ্ধে যায় এবং তখন জয়ের চেষ্টা করে।”
জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধে নামার আগেই জয়ী হয়ে যাওয়ায় মেটিকুলাস সমর বিজ্ঞানী ‘সান জু’র সেই কথাটা এখন বার বার মনে পড়ছে।
‘সান জু’র এই কথাটিই মেটিকুলাস ডিজাইনের মূলমন্ত্র। যার মূল কথা হচ্ছে গভীরভাবে পরিকল্পনা করা, সুক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ করা এবং তারপর নিখুঁতভাবে তা বাস্তবায়ন করা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নতুন লোগোর বিষয়ে ঠিক এভাবেই মেটিকুলাস ডিজাইনে কাজ করেছে। যার কারণে দেশের সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিক পরিমন্ডলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতের মেটিকুলাস ডিজাইনের খসড়া লোগো প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে যেভাবে ভাইরাল করা হয়েছে, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলের লোগো এভাবে ভাইরাল হেওয়ার সুযোগ পায়নি।
জামায়াতের বহুল আলোচিত লোগোটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অফিসিয়ালি প্রকাশও করা হয়নি। তাতেই ভাইরাল হয়ে যাওযায় এই লোগোই এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।
জামায়াতের সেই ভাইরাল লোগোর স্পাইরাল ব্র্যান্ডিং দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, জামায়াতে ইসলামী এখন দেশে বিদেশে কতোটা জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে।
দল-মত নির্বিশেষে দেশের গণমানুষ জামায়াতে ইসলামীকে কতোটা ভালোবাসে এবং সিরিয়াসলি পর্যবেক্ষণ করে তা গত দুই দিনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চিত্র দেখলেই অনুমান করা যায়।
ভাইরাল লোগো নিয়ে সমালোচনা পর্যালোচনা এবং পরামর্শের ধরণ দেখে প্রমান পাওয়া গেছে যে, জামায়াতের চরম দুষমনরাও বিশ্বাস করে যে জামায়াত আসলেই ইসলামী বিপ্লবের জন্য উপযুক্ত একটি দল।
১৯৪৪ সালের ৬ জুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপারেশন ওভারলর্ডের মাধ্যমে মিত্রবাহিনী নরম্যান্ডায় জার্মান দখলদারিত্ব ভাঙতে আক্রমণ চালায়। এই অভিযান ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল সামরিক অপারেশনগুলোর একটি, যার সাফল্য নির্ভর করেছিল মেটিকুলাস ডিজাইনের উপর।
২০০৭ সালে স্টিভ জবস আইফোন উন্মোচন করেন, যা স্মার্টফোন শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঝড় তোলে। এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল অ্যাপলের নিখুঁত বিপণন ও মেটিকুলাস ডিজাইনের ফল।
১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদে পা রাখেন। এই মিশনের পেছনে ছিল নাসা’র বছরব্যাপী মেটিকুলাস ডিজাইনের ফল।
২০২০ সালে ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্না করোনা ভাইরাসের mRNA ভ্যাকসিন রেকর্ড সময়ে তৈরি করে। এটি সম্ভব হয়েছিল বৈজ্ঞানিক ও লজিস্টিক মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে।এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, জরুরি পরিস্থিতিতে মেটিকুলাস ডিজাইন জীবন বাঁচাতে পারে।
উপরে বর্নিত এসব সাফল্য প্রমাণ করে যে, মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে মেটিকুলাস ডিজাইন অপরিহার্য।
জামায়াতের এই খসড়া লোগোর ডিজাইনটিও ঠিক তেমনিভাবে মেটিকুলাস ডিজাইনে করা হয়েছে। এটি আগের লোগোর চেয়ে অনেক বেশি মিনিমালিস্টিক,সফিস্টিকেটেড অথচ শক্তিশালী।
জামায়াতের এই খসড়া লোগো প্রকাশের নাটকীয়তা ও কৌশল,সব কিছুতেই ছিল মেটিকুলাস ডিজাইনের ছোঁয়া।
সমালোচকরা বলেছেন যে, জামায়াত তাদের লোগো থেকে আল্লাহ শব্দ বাদ দিয়েছে। আসলে কিন্তু আল্লাহ শব্দ বাদ দেয়নি। আল্লাহ শব্দটি ক্যালিওগ্রাফিতে সুন্দরভাবে ফুটে তোলা হয়েছে। চারটি স্তম্ভের মাধ্যমে আল্লাহ শব্দটি লেখা হয়েছে, যা ন্যায়-ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ধারণ করে আছে। আল্লাহ শব্দের ক্যালিওগ্রাফিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আসমানী হিকমত ‘কলম’ সংযোজন করায় লোগোটির ভাবগাম্ভির্য এবং তাৎপর্য আরো বহুগুন বৃদ্ধি করেছে। কাজেই যারা হতাশ হয়েছিলেন তাদের জন্য এটা আশার সংবাদ হতে পারে।
আসলে মেটিকুলাস ডিজাইনের লোগো বুঝতে গেলে মেটিকুলাস দৃষ্টিশক্তি থাকতে হয়। এটা সবারই থাকে না। তাই খসড়া লোগো নিয়ে অনেক ভুলবুঝাবুঝিও হয়েছে।
জামায়াত এই লোগোটি আরো পরিমার্জন করে তারপর অফিসিয়ালি এটি প্রকাশ করলে সব ভুণবুঝাবুঝির অবসান হবে বলে আশা করা যায়। পরিমার্জনের সময় লোগোটিতে ‘আকিমু্দ্দ্বীন’ শব্দটি সংযোগ করলে আরো ভালো হবে বলেও অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন।
স্পাইরাল ব্র্যান্ডিংটা কী ?
স্পাইরাল ব্র্যান্ডিং (Spiral Branding) বলতে বোঝায় একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া যেখানে পণ্য, সেবা বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের,কিংবা দলীয় আদর্শের ব্র্যান্ডিং-এর মাধ্যমে একটি স্থির, ধারাবাহিক এবং সুপরিচিত চিত্র তৈরি করা হয়, যা গ্রাহক বা অন্যদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিচিতি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো একটি পণ্যের বা ব্যক্তির বা আদর্শের “স্বতন্ত্র” এবং “স্থায়ী” পরিচয় তৈরি করা, যা সময়ের সাথে সাথে গ্রাহকদের মনে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে।
জামায়াতের মেটিকুলাস ডিজাইনের এই খসড়া লোগো প্রকাশের পর জামায়াত দেশ-বিদেশে যেভাবে ব্র্যান্ডিং হয়েছ, সেটা আসলে স্পাইরাল ব্র্যান্ডিংয়ের একটা অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *