নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাবিষয়ক সম্মেলন ‘এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ফোরাম ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে সফল যুক্তরাজ্য সফর শেষে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদি আমিন। গত ১৭ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তারা দুজনেই অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন। সফরকালে প্রতিদিন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে আধুনিক, প্রযুক্তি-নির্ভর ও কর্মমুখী পরিবর্তনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
সফর শেষে দেশে ফিরে সংবাদদাতাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষা মন্ত্রী ও উপদেষ্টা জানান, আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনই ছিল এই সফরের মূল লক্ষ্য। এ সময় শিক্ষা মন্ত্রী প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন, যার মধ্যে রয়েছে সনাতন মুখস্থ পদ্ধতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মেধা, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো, শিক্ষার্থীদের কেবল সনদ বা সার্টিফিকেট সর্বস্ব না বানিয়ে দক্ষ, কর্মসংস্থান উপযোগী ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা।
এই সফরের অন্যতম বড় ও ঐতিহাসিক প্রাপ্তি হলো বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলের সাথে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। ‘গুগল ফর এডুকেশন’-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারের অত্যন্ত প্রশংসিত ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুগলের কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। শিক্ষকদের ‘পরিবর্তনের অগ্রদূত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে শিক্ষা মন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, দেশের প্রতিটি শিক্ষকের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস বা ট্যাব তুলে দেওয়া হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষা মন্ত্রী বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন, যা বিশ্ব দরবারে সমাদৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষার্থীদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে মাতৃভাষা ও ইংরেজি ছাড়াও বাধ্যতামূলকভাবে ‘তৃতীয় একটি আন্তর্জাতিক ভাষা’ শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া, মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো যাতে শিক্ষার্থীরা দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে জিডিপির (GDP) ৫ শতাংশে উন্নত করার মহাপরিকল্পনা এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণের ঘোষণা।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, শিক্ষা মন্ত্রী ও উপদেষ্টার এই লন্ডন সফর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি আধুনিক, আনন্দময় এবং শতভাগ প্রযুক্তি-নির্ভর কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক এই অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের নতুন প্রজন্ম কেবল পুথিগত জ্ঞান অর্জন করবে না, বরং তারা সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন দক্ষ আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে—বর্তমান সরকারের এই চূড়ান্ত প্রত্যাশাই ফুটে উঠেছে এই সফরের প্রাপ্তিতে।
লন্ডন সফর শেষে দেশে ফিরলেন শিক্ষা মন্ত্রী ও উপদেষ্টা: বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত
