ন্যাশনাল টি’র আর্থিক হিসাবে গরমিল পেয়েছে নিরীক্ষক

বিটিএন ডেস্কঃ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের অর্থিক প্রতিবেদনে বেশ কিছু গরমিল পেয়েছে নিরীক্ষক। আলোচিত হিসাব বছরে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছেন আর্টিসান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সিনিয়র পার্টনার মো. আব্দুস সালাম। নিরীক্ষক তার মতামতে আর্থিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ, আইনি লঙ্ঘন ও আর্থিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে নিরীক্ষক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক হিসাবমান (আইএএস) অনুসারে সম্পদের ওপর অবচয় ধার্য করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড হিসাবমান অনুসারে অবচয় ধার্য করেনি। এর মাধ্যমে কোম্পানিটির স্থায়ী সম্পদ, বার্ষিক মুনাফা ও সংরক্ষিত আয় বেশি দেখানো হয়েছে।

কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ২৩৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকার ‘বিয়ারার প্লান্ট’ (চা গাছ) সম্পদ হিসেবে দেখালেও আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসারে এক্ষেত্রে কোনো অবচয় ধার্য করেনি। উল্টো কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছাড়াই এককালীন ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা অবচয় সঞ্চিতি দেখিয়েছে, যা স্থায়ী সম্পদ, বার্ষিক মুনাফা ও সংরক্ষিত আয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি নিয়ম ভেঙে অপরিপক্ব চা গাছকে সরাসরি স্থায়ী সম্পদ দেখানো হয়েছে।

এছাড়া ১৭৫ কোটি ১২ লাখ টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মধ্যে এক বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য অংশকে আলাদা চলতি দায় হিসেবে দেখানো হয়নি। শ্রমিকদের ৩১ কোটি ২৬ লাখ টাকার গ্র্যাচুইটি প্রভিশন রাখা হলেও হিসাবমান অনুযায়ী কোনো অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন করা হয়নি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়, ৩০ জুন ২০২৫ এ গ্র্যাচুইটি ফান্ডের সমাপণী ব্যালান্স ছিল সম্পূর্ণ শূন্য। পাশাপাশি বাগান ও প্রধান কার্যালয়ের লেনদেনে ৯৫ লাখ টাকার গরমিল পর্যাপ্ত নথিপত্র ছাড়াই ‘ট্রেড পেঅ্যাবল’ হিসেবে দেখিয়ে দায় বাড়ানো হয়েছে।

নিরীক্ষকের মতামতে কোম্পানিটির মূলধন সংগ্রহ এবং করপোরেট সুশাসনের ক্ষেত্রে মারাত্মক কিছু আইনি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান লঙ্ঘন দেখা গেছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ (বিএসইসি) বিভিন্ন সরকারি সংস্থা তদন্ত করছে। বিএসইসি কোম্পানিটিকে ২৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর সম্মতি দিলেও চাঁদা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই এবং পরিচালনা পর্ষদের কোনো অনুমোদন ছাড়াই ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাইট শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। শুধু তা-ই নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত লঙ্ঘন করে সংগৃহীত অর্থ থেকে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর কোনো ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনও বিএসইসিতে জমা দেওয়া হয়নি।

২০১৯-২০ হিসাব বছর থেকে কোম্পানির লোকসান ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। নিলাম বাজারে চায়ের গড় মূল্য কমে যাওয়ার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির বিক্রি থেকে আয় ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা কমেছে। একই সময়ে ব্যাংক ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ ব্যয় ১২ কোটি টাকা বেড়েছে। চার বছর ধরে কোম্পানিটি ব্যবসা থেকে কোনো ইতিবাচক নগদ প্রবাহ তৈরি করতে পারছে না। এ নেতিবাচক নগদ প্রবাহের কারণে কোম্পানির পক্ষে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ ও দৈনন্দিন বাধ্যবাধকতা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কোম্পানির দায় সম্পদের চেয়ে বেশি হওয়ায় এর ইকুইটি সম্পূর্ণ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে, যা তীব্র আর্থিক দেউলিয়াত্ব নির্দেশ করে। যদিও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গুণগত উৎপাদন বৃদ্ধি, পণ্য বহুমুখীকরণ এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং চলতি মূলধনের জন্য ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছে, তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি কোম্পানির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে বলে নিরীক্ষকের মতামতে উঠে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *