জুলাই বিপ্লবীদের ফাঁসিতে ঝুলানো এবং ফের ফ্যাসিবাদ ফেরানোর নীলনকশা

নির্বাচনের পর ‘জুলাই সনদ’ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবীদের সমুলে বিনাশ করার মাধ্যমে দেশে আবার ফ্যা.সিবাদ কায়েমের নীলনকশা বাস্তবায়নের শেষ দৃশ্য মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে। মঞ্চের পেছনে গ্রীনরুমে বসে কলকাঠি নাড়ছে ভারতীয় কলাকুশলীরা।জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে ভোটের ‘আগে’ না ‘পরে’ এবং জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত ‘হবে’ কি ‘হবে না’-এই দুই প্রশ্নে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিরোধী আধিপত্যবাদী শক্তি।নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার যাতে কোনভাবেই জুলাই সনদ ছুঁড়ে ফেলতে না পারে এবং জুলাই বিপ্লবীদের ধ্বংস করে পূণরায় ফ্যা.সিবাদ কায়েম করতে না পারে, সেজন্য নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং জুলাই জাতীয় সনদকে সংবিধানে সংযুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তি।অপরদিকে জুলাই প্লিবের বিপক্ষ শক্তি দাবি তুলেছে, নির্বাচনের পরের সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব। তারা জুলাই সনদকে সংবিধানে যুক্ত করতেও দিচ্ছে না।বাংলাদেশ আবার ফ্যা.সিবাদের কবলে পড়বে কি না, সেটা নির্ভর করছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর। সেই মহা গুরুত্বপূর্ণ জুলাই সনদ ভোটের আগে বাস্তবায়িত হবে, নাকি ভোটের পরে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া হবে সেটা নিয়েও সুক্ষ্ণ কৌশলে ঐক্যবদ্ধ জাতিকে এখন দ্বিধাবিভক্ত করা হচ্ছে।জুলাই সনদের যাতে কোন সাংবিধানিক ভিত্তি না থাকে এবং নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার ফ্যাসিবাদ ফেরাতে পারে, সেজন্য সংবিধানে জুলাই সনদ সংযুক্ত করতে রাজি হচ্ছে না এক পক্ষ।জুলাই সনদের যাতে সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয় এবং নির্বাচিত সরকার জুলাই যেনো সনদ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার ফ্যাসিবাদ ফেরাতে না পারে, সেজন্য সংবিধানে জুলাই সনদ সংযুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে অপর পক্ষ।বিএনপি ভোটের আগে জুলই সনদের বাস্তবায়ন চায় না। পক্ষান্তরে জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো ভোটের আগেই জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন চায়।বিএনপি জুলই সনদকে সংবিধানে স্থান দিতে চায় না। পক্ষান্তরে জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো জুলই সনদকে সংবিধানে স্থান দেওয়ার দাবিতে অনড় রয়েছে।জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো যুক্তি দেখাচ্ছে যে, ভোটের পরে নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। জুলাই সনদকে সংবিধানে স্থান না দিলে নির্বাচিত সরকার সেটাকে বেমালুম ছুঁড়ে ফেলে দিবে বলে তারা দাবি করছে।এখনকার আলামত দেখেও বুঝা যাচ্ছে যে, ভোটের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে এবং সংবিধানে যুক্ত না করলে, নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ ছুঁড়ে ফেলে দিবে এবং দেশে আবার ফ্যা.সিবাদ কায়েম হবে। সেই ফ্যা.সিবাদ অনায়াসে জুলাই বিপ্লবীদের ফাঁ.সিতে ঝুলাবে।জুলাই সনদের তিন ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি নয় বিএনপি। তারা জানিয়েছে, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। জুলাই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলে অঙ্গীকারনামায় যে কথা বলা হয়েছে সেটাতেও আপত্তি জানিয়েছেন তারা।কোনো রাজনৈতিক ‘সমঝোতার দলিল’ সংবিধানের উপরে স্থান পেতে পারে কিনা- সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির ভাষ্য, জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে জায়গা দেওয়ার সুযোগ নেই।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে প্রাধান্য দেওয়া হলে খারাপ নজির তৈরি হবে।বিএনপির এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে ঐকমত্য কমিশন । কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে তার মধ্যে অনেককিছুই সংবিধান সম্পর্কিত। এগুলোর “অনেকগুলোতেই সব দল একমত হয়েছে”। কমিশন প্রস্তাব করেছে এগুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে। এখন সেগুলোকে যদি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বলা হয়, তাতে করে এটা সংবিধানের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না।বিএনপির প্রস্তাবের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ভোটের আগেই সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্য সংবিধানে স্থান দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।গত রোববার ‘জুলাই ঘোষণা এবং জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক জামায়াত আয়োজিত এক সেমিনারে দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, সেগুলো অবশ্যই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করতে হবে।আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জুলাই জাতীয় সনদ তথা সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন চাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাই সনদের সব প্রস্তাব বিধিবিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।স্বাধীনতা পরবর্তী চুয়ান্ন বছরের দুর্নীতি-দু:শাসন, স্বৈরাচারী শোষণ-নির্যাতন এবং একদলীয় দুর্বৃত্তদের গঞ্জনা-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মানই ছিলো চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের ‘জনআকাঙ্খা’।সেই ‘জনআকাঙ্খা বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কার। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম ধাপে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেই সংস্কার কমিশনগুলো প্রণীত ৮৪টি প্রস্তাবের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়েই তৈরি করা হচ্ছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।গত ২৯ জুলাই রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদের একটি খসড়া দিয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেটার ওপর দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ‘সমন্বিত খসড়া’।জুলাই সনদের প্রথম খসড়ায় বলা হয়েছিল, আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে দলগুলো। এ বিষয়ে বিএনপি একমত হলেও জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ আরও কিছু দলের আপত্তি ছিল। তারা সনদকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা এবং সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিলো।গত ১৬ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সেই ‘সমন্বিত খসড়া’ পাঠানো হয়। গত ২২ আগস্ট পর্যন্ত সেই ‘সমন্বিত খসড়া’ সংশোধন প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনের জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল। বিএনপি জামায়তসহ মোট ২৩টি দল সমন্বিত খসড়া নিয়ে মতামত জমা দিয়েছে।আজ শনিবার ঐকমত্য কমিশনের সভা। কোনো সংযোজন বা বিয়োজন থাকলে সেটা নিয়ে আলোচনা হবে। পরে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হতে পারে।যেটাই হোক, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কে সাংবিধানিক মর্যাদা না দিলে এবং বাস্তবায়নের পথ বের না করলে ; ফের ফ্যা.সিবাদের কবলে পড়বে বাংলাদেশ। সেই ফ্যা.সিস্ট অনায়াসে ফাঁ.সিতে ঝুলাবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *