চট্টগ্রামে দুদকের জালে ফেঁসে গেলেন রেল (পূর্বাঞ্চল)এর আইন কর্মকর্তা জিনিয়া নাসরিন!

 

 

মোহাম্মদ ফোরকান, চট্টগ্রাম :

রেলের পূর্বাঞ্চলের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অফিসে প্রধান অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করতেন শেখ মো. লোকমান হোসেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ইচ্ছে মতো নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের দেদারসে চাকরি দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হেডকোয়ার্টার সিআরবিতে আইন দপ্তরের সিআই পদে কাজ করছেন লোকমান হোসেনের মেয়ে জিনিয়া নাসরিন (সিটিআই গ্রেড-১)। তার বিরুদ্ধে সরকারী চাকরিতে যোগদানের সময় তথ্য গোপন ও দীর্ঘদিন দ্বৈত পেশায় নিয়োজিত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বার কাউন্সিল ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরের নথির আলোকে নতুন করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

দুদকের স্মারক (২৩ এপ্রিল ২০২৩) ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা (৫ মে ২০২৪) অনুসারে, জিনিয়া নাসরিন ২০১০ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে এনরোলমেন্ট গ্রহণ করে চট্টগ্রাম জেলা বারের সদস্যপদ পান। এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত সনদ নবায়ন ও বার্ষিক চাঁদা প্রদান করে আসেন। অথচ ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে তথ্য গোপন করে চাকরিতে যোগদান করেন।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি বার কাউন্সিলের সদস্যপদ স্থগিত বা পরিত্যাগ না করেই দীর্ঘদিন দ্বৈত অবস্থান বজায় রেখেছেন। পূর্বাঞ্চলের চীফ পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) দপ্তর থেকে ধারাবাহিকভাবে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম কমিটি (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪) অভিযুক্ত কর্মকর্তার পদ মর্যাদার চেয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা দিয়ে গঠিত হওয়া তদন্ত কমিটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে কমিটিগুলোতেও সদস্য অব্যাহতি দেয়ার ঘটনা ঘটে।

অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ১২তম গ্রেডের কর্মকর্তা দিয়ে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো সরকারি চাকরিবিধির পরিপন্থী, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের শামিল। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালা ১৯৭২ অনুযায়ী, একজন আইনজীবী অন্য কোনো পেশা বা সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকতে পারেন না।

একইভাবে, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির গঠনতন্ত্রেও সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত সদস্যের সদস্যপদ বাতিল করার বিধান রয়েছে। নথি অনুযায়ী, অভিযোগ উত্থাপনের পর ২০২৪ সালের মার্চ মাসে জিনিয়া নাসরিন বার কাউন্সিলে সদস্যপদ স্থগিতের আবেদন করেন। তবে অভিযোগকারীর দাবি, এটি মূল অভিযোগের পর আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সম্প্রতি মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) একটি নতুন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। এ কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত জিএম (পূর্ব), অতিরিক্ত সিসিএম (পূর্ব) এবং ডিইও (সদর)।

কমিটিকে আগামী ৩ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহল মনে করছে, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়, বরং চাকরিবিধি, বার কাউন্সিল আইন এবং রেলওয়ে সার্ভিস রুলস লঙ্ঘনের একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।

এদিকে তথ্য সূত্রে আরও জানা যায়, লোকমান হোসেনের আরেক ছেলে সাইমুম হোসেনও চট্টগ্রামে জুনিয়র টিটিই হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সংস্থাপন অফিসে এমএলএসএস হিসেবে কাজ করেন তার আরেক মেয়ে তানজিদা আকতার। জিনিয়া নাসরিন ও সাইমুম হোসেন, লোকমান হোসেনের প্রথম স্ত্রীর ছেলেমেয়ে এবং তানজিদা তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে।

রেলের ঢাকা বিভাগে কর্মরত ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর মো. হাসেম তার ভাগ্নে। কয়েক মাস আগে হাসেমের বউ রিমা আকতার চাকরি পেয়েছেন। চট্টগ্রাম স্টেশনে পোর্টার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। সর্বশেষ রেলে নিয়োগ পাওয়া তিনজন পোর্টারের একজন রিমা। ভাগ্নে হাসেমের ভাই মো. আজিম খালাসি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এখন চট্টগ্রামের সিআরবি পাওয়ার হাউসে কাজ করছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমার্শিয়াল অফিসের আওতায় প্রেষণে গার্ড হিসেবে কাজ করছেন লোকমানের ভাতিজা নেজাম উদ্দিন ও জুনিয়র টিটিই শাহাদাত হোসেন, চিফ ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার অফিসে এমএলএসএস পদে কাজ করছেন তার ভাতিজা আবু খালেদ, একই অফিসে এমএলএসএস পদে আছেন নাতি রিদোয়ান হোসেন, চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ড স্টেশনের পোর্টার মো. বাবুলও তার ভাইয়ের ছেলে।

ডিভিশনাল কমার্শিয়াল অফিসের অধীনে স্টেশনে কর্মরত আরাফাত হোসেন তানভীর সম্পর্কে লোকমান হোসেনের নাতি হন। আকতার হোসেন ও রোকসানা আকতার নামে তার দুই ভাইপো-ভাতিজি কাজ করছেন চট্টগ্রাম ডিভিশনাল কমার্শিয়াল অফিসে, সিআরবিতে আয়া হিসেবে কর্মরত বেবী আকতারও তার ভাতিজি।

খালাসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সিআরবির পাওয়ার হাউসে কাজ করছেন তার ভাতিজি আয়েশা আক্তার। এছাড়া সিআরবির রেলওয়ে মেডিকেলে চৌকিদার পদে রয়েছেন লোকমানের ভাতিজা আমিনুল ইসলাম, খালাসি পদে নিয়োগ পাওয়া আরেক ভাতিজা মো. আফসার হোসেন ও ক্লিনার হিসেবে কাজ করছেন ভাতিজি বেলী আকতার। এবার রেলে ৮৬৫ জনকে খালাসি পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে। এ পদেও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়ের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রেল শ্রমিকলীগ নেতা বলেন, রেলে পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয় ছাড়াও পাড়া-প্রতিবেশীকেও চাকরি দিয়েছেন লোকমান হোসেন। নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময় একাই প্রায় একশ’ লোককে চাকরি দিয়েছেন। একইসঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়েছেন।

আপনজনদের ভালো ভালো জায়গায় পদায়নও করেছেন লোকমান। ভালো ভালো কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। তার মেয়ে জিনিয়া নাসরিনের নামে বরাদ্দ রয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলীর আমবাগান অফিসার্স কলোনির এ/২২ নম্বর বাংলোটি। কিন্তু সেখানে তিনি থাকেন না। বাংলোটি ভাড়া দেয়া হয়েছে। বাংলোর উন্মুক্ত জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে এক ও দুই কক্ষ বিশিষ্ট ৭-৮টি ঘর। সেগুলোও ভাড়া দিয়েছেন জিনিয়া। বাবা নেতা হওয়ায় কিছুই করতে পারছে না অসহায় রেল কর্তৃপক্ষ। লোকমানের ছেলে জুনিয়র টিটিই সাইমুম হোসেনের নামেও একটি বাসা বরাদ্দ রয়েছে আমবাগান এলাকায়। তার ভাগ্নে রেলের ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর মো. হাসেমের নামে বরাদ্দ রয়েছে টাইগারপাস এলাকার ডিএসআর/৪/এ নম্বরের বাসাটি। অন্য আত্মীয়স্বজনরাও ভোগ করছেন নানা সুযোগ-সুবিধা।

অনুসন্ধানে উঠে আসা পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের নাম তুলে ধরে তারা কীভাবে রেলে চাকরি পেলেন জানতে লোকমান হোসেনের মুঠোফোনে বেশ ক’বার কল করা হলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *