গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ জ্বালানি সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে গাইবান্ধা শহরের স্বাভাবিক যান চলাচল। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের তীব্র সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে মাত্র ১০০ টাকার তেল পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে টানা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত। এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে শহরের সবচেয়ে বড় দুই ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে।
শুক্রবার (২০ মার্চ) বিকেল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে— পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও উত্তেজনা, কোথাও পুলিশি পাহারায় তেল বিতরণ চলছে।
পাম্পে পাম্পে ভিড়, উত্তেজনা ও সংঘর্ষ
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পাম্প মালিকদের সঙ্গে গ্রাহকদের নিয়মিত তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তা সংঘর্ষেও রূপ নিচ্ছে। কোথাও কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর তেল বিতরণ করতে হচ্ছে পুলিশি নিরাপত্তায়।
ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শহরে এত মোটরসাইকেল আগে কখনো তেল নেয়নি। বাইরের এলাকা থেকেও হাজার হাজার বাইক আসছে। এতে চাপ অনেক বেড়ে গেছে।
সূত্রটি আরও জানায়, অনেকের বাইকে আগেই ২ থেকে ৫ লিটার তেল থাকে, কারো কারো ট্যাংক ফুল। তারপরও আতঙ্কে বারবার তেল নিচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়িতেও সীমিত আকারে মজুত করছেন। এতে সংকট আরও বাড়ছে।
বন্ধ বড় দুই ফিলিং স্টেশন
জেলা শহরে মোট চারটি ফিলিং স্টেশন থাকলেও এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি—এস এ কাদির অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশন ও রহমান ফিলিং স্টেশন— জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।
এস এ কাদির অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের ক্যাশ সরকার মিঠু মিয়া বলেন, পেট্রোল ও অকটেন না থাকায় গত তিন দিন ধরে পাম্প বন্ধ। শুধু কিছু ডিজেল ছিল, সেটাও বাইরে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রশাসনের গাড়ির জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। আগামী দুদিন তেল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রতিদিন ২০০০-২৫০০ লিটার পেট্রোল, ১৫০০-২০০০ লিটার অকটেন এবং প্রায় ১২ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও দুই দিন পরপর মাত্র ৪৫০০ লিটার দেওয়া হয়। তার ওপর শুক্রবার ও শনিবার সরবরাহ বন্ধ থাকে।
রহমান ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জুয়েল মিয়া জানান, দিনভর ১০০ টাকার করে পেট্রোল দিয়েছি। তাতেও কুলানো যায়নি। সন্ধ্যার আগেই শেষ হয়ে গেছে। অকটেন আগেই ছিল না। এখন পাম্প বন্ধ। প্রতিদিন প্রায় ২০০০ লিটার পেট্রোল, ১৫০০ লিটার অকটেন এবং ১০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ মিলছে না।
সীমিত তেল, রাতভর অপেক্ষা
শহরের অদূরে অবস্থিত হাসনা ফিলিং স্টেশন ও গাইবান্ধা ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র। হাসনা ফিলিং স্টেশনে সন্ধ্যা থেকেই তেলের গাড়ির অপেক্ষায় ভিড় বাড়তে থাকে। রাত ১০টার পর দিকে সীমিত আকারে তেল বিতরণ শুরু হয়।
মেসার্স হাসনা অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, জ্বালানি না থাকায় পাম্প বন্ধ ছিল। সন্ধ্যায় গাড়ি এসেছে। রাত ৮টার দিকে দেওয়ার কথা থাকলেও ১০টার দিকে তেল দেওয়া শুরু হয়েছে। যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ দিতে পারবো।
মারামারি, আহত কর্মচারী
দাঁড়িয়াপুর রোডের গাইবান্ধা ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া হয়েছে পুলিশি পাহারায়। কারণ গতকাল শুক্রবার দুপুরে তেল না পেয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে দুই কর্মচারী আহত হন। একজনের মাথা ফেটে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
পাম্পটির তত্ত্বাবধায়ক শাহেদ বলেন, অকটেন আগেই ছিল না। সন্ধ্যায় ৩ হাজার লিটার পেট্রোল এসেছে। রাত ১০টার দিকে পুলিশি সহায়তায় কিছুক্ষণ তেল দিতে পেরেছি, পরে বন্ধ করেছি।
বন্ধ রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুক্রবার দুপুরে শহরতলীর কয়েকজন যুবক এসে তেল না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। আমরা বাধা দিতে গেলে আমাদের ওপর হামলা করে। এতে আমাদের দুজন কর্মচারী আহত হয় তাদের মধ্যে একজনের মাথা ফেটে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনের নিয়ম মেনে সীমিত তেল দেওয়ায় অনেক গ্রাহক ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কেউ জোর করে বেশি নিতে চান। না দিলে হুমকি-ধমকি, ভাঙচুর পর্যন্ত হচ্ছে। তার জোরালো অভিযোগ বিষয়টি এসি ল্যান্ডকে একাধিক বার জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এদিকে ঈদের দিন শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পুলিশ না থাকায় তেল দেওয়া শুরু হয়নি এ পাম্পে। এদিন মোবাইল ফোনে তত্বাবধায়ক শাহেদ বলেন, পাবলিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, পুলিশ ছাড়া তেল দেবো না আমরা। এ পাম্পে প্রতিদিন ২০০০ লিটার পেট্রোলের চাহিদা থাকলেও গত ১১ মার্চ পেয়েছি মাত্র ৩০০০ লিটার। প্রতিদিন ৬০০ লিটার অকটেনের চাহিদা রয়েছে। কিন্ত আসছে অর্ধেকেরও কম।
প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণেও বাড়ছে সংকট
সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের তদারকিতে নির্ধারণ করা হয়েছে— মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা (বর্তমানে ১০০ টাকা), বাস-ট্রাকে, ২০০-২২০ লিটার, পিকআপে ৭০-৮০ লিটার, প্রাইভেট কারে সর্বোচ্চ ১০ লিটার, তবে সংকট বাড়ায় শুক্রবার থেকে মোটরসাইকেলে ১০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হয়নি।
ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
বিকেলে রহমান ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা নূর আহমেদ বলেন, চার কিলোমিটার দূর থেকে এসেছি। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছি, সামনে আরও অনেক গাড়ি।
আরেক গ্রাহক রনি মিয়া বলেন, তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে ১০০ টাকার তেল পেলাম। এটা হতে পারে না। সময়ের মূল্য আছে। সরকার বলছে তেলের মজুত আছে— তাহলে সরবরাহ বাড়ছে না কেন?
শহরের এস এ কাদির ফিলিং স্টেশন ও রহমান ফিলিং স্টেশনে রাতে তেল না পেয়ে অন্তত ৫০ জন মোটরসাইকেল চালককে ফিরে যেতে দেখা গেছে।
সমগ্র পরিস্থিতি বলছে, গাইবান্ধায় জ্বালানি সংকট এখন চরমে—সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ফিলিং স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার লিটার পেট্রোল, ৪ হাজার লিটার অকটেন এবং ৩২ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে অর্ধেকেরও কম।
পাম্প মালিক পক্ষের দাবি, সরকারিভাবে মজুত থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে পাম্পগুলোতে তেল নেই। অগ্রিম টাকা দিয়েও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
