বিটিএন ডেস্কঃ বর্তমান বিশ্বে সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ পরিবর্তন, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
একজন সাংবাদিক সমাজের চোখ, কান এবং বিবেক হিসেবে কাজ করেন। তিনি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা-সম্ভাবনা এবং ন্যায়-অন্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করেন। তাই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সত্যনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠতা, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম।
একজন সচেতন নাগরিকের মতো একজন সাংবাদিকেরও নিজের জন্মভূমি, সমাজ ও দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা প্রয়োজন। কারণ যে ব্যক্তি নিজের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসেন না, তিনি কখনোই দেশের প্রকৃত কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে এবং উন্নয়নের পথে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই উন্নয়ন সম্ভব। আর এই ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সাংবাদিকদের কলম সমাজের নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে উন্নয়ন, মানবিকতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সামাজিক সম্প্রীতির ইতিবাচক দিকগুলোও জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারে।
ফলে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের কারণে গুজব ও অপপ্রচারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচারিত একটি মিথ্যা তথ্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা পুরো সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গুজব মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সত্য তথ্য যাচাই করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা এবং গুজব প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ভূমিকা পালন করা সময়ের দাবি। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ স্বাধীন ও নিরাপদ সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। একজন সাংবাদিক যখন নির্ভয়ে সত্য প্রকাশের সুযোগ পান, তখন সমাজের বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে উঠে আসে। তাই সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়গুলো রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সমাজে এমন কিছু মানুষও রয়েছেন, যারা বাহ্যিকভাবে সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের কথা বললেও অন্তরে লালন করেন হিংসা, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা।
এ ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এসব মানুষ নীরবে সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো এমন সামাজিক ব্যাধি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা এবং ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা।
একটি সভ্য, সচেতন ও উন্নত সমাজ গঠনে সত্যের বিকল্প নেই। সত্য সমাজকে আলোকিত করে, মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে এবং উন্নয়নের পথকে সুদৃঢ় করে। অন্যদিকে মিথ্যা, গুজব ও বিদ্বেষ সমাজকে পিছিয়ে দেয়। তাই সাংবাদিকদের উচিত সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা এবং সর্বস্তরে তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করা।
দেশপ্রেম, মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পেশাগত সততার সমন্বয়েই একজন সাংবাদিক প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারেন। সাংবাদিকতা তখনই সার্থক হবে, যখন তা মানুষের কল্যাণে, সমাজের উন্নয়নে এবং সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিরলসভাবে কাজ করবে। একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনের পথে সাংবাদিক সমাজের এই দায়িত্বশীল ভূমিকা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।
লেখক:
মোঃ ওসমান গনি ইলি
সাধারণ সম্পাদক
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা কক্সবাজার জেলা কমিটি।
