রোকেয়া’র জন্ম এবং মৃত্যু দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়
আশরাফ খান কিরণ রংপুর ব্যুরো প্রধান: বাঙালির আধুনিক যুগের ইতিহাসে যে নারীর নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তিনি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ছিল মহিয়সী রোকেয়া’র ৪৪তম জন্ম এবং ৯২তম মৃত্যু দিবসে এমন মন্তব্য করেছেন অনুষ্ঠানের আলোচকরা। এর আগে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুস্পস্তব অর্পন করা হয় রোকেয়ার প্রতিকৃতিতে। বাংলা একাডেমির সঙ্গে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা সই এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে রোকেয়ার জীবনকর্ম, প্রচার-প্রসার, গবেষণা ও চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হবে। সেখানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা যাবে। নতুন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এমনটি জানিয়েছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী। প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে রোকেয়ার দর্শন বিকাশের সঙ্গে স্মৃতিকেন্দ্রটিকে আলোকিত দেখতে চান। গবেষকরা বলছেন, আজীবন ‘বেগম প্রথা’র বিরুদ্ধে রোকেয়া লিখেছেন-লড়েছেন, কিন্তু সেই ‘বেগম’ শব্দটি তারই নামের সঙ্গে ভুলভাবে সাঁটানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে রোকেয়া অনুরাগীদের।
রোকেয়ার জন্মভিটায় ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন সরকার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০০১ সালের ১ জুলাই রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের উদ্বোধন করে।এরপর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে স্থবির হয়ে পড়ে স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম। ২০১৯ সালের দিকে এখানে সীমিত পরিসরে সংগীত, চিত্রাংঙ্কনসহ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়। এরপর করোনার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালের দিকে আবারও সংগীত কোর্স চালু করলেও সেটি বেশি দিন চালানো সম্ভব হয়নি। রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় সংগঠকদের মনে। রোকেয়ার জন্মভিটা দেখতে এসে ক্ষুদ্ধ দর্শনার্থীরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের কমতি নেই। তারা বলছেন, রোকেয়ার স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান আজও পড়ে আছে অবহেলায়।
সরকারের স্বদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে এখনো রোকেয়াচর্চা ও সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রের দ্বারও রুদ্ধ। উদ্ধার হয়নি বেহাত হওয়া সম্পত্তি, মসজিদ, দিঘীসহ কোনো কিছুই। আঁতুর ঘরটিও হয়নি সংস্কার। রোকেয়ার দেহাবশেষ কলকাতা থেকে পায়রাবন্দে আনার প্রতিশ্রুতিও লালফিতাবন্দি। অযত্ন আর অবহেলায় মহিয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মভিটায় প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিকেন্দ্রটি দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে অবহেলিত। রোকেয়ার প্রতি চরম অবহেলা করা হচ্ছে। জন্মভিটায় রোকেয়ার ঘরের দেয়ালগুলো বিলীনের পথে। শ্যাওলা জমে সব ইট নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই এখানে দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরিসহ এগুলোকে সংরক্ষণ করা হোক। বেশিরভাগ কক্ষের দরজা, জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। অবকাঠমো আছে, জনবল আছে, নেই শুধু কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ। সরকার এত বড় অবকাঠামো কেন অযত্নে-অবহেলায় ফেলে রেখেছে জানি না। এই স্মৃতিকেন্দ্রে বছরব্যাপী নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক। সরকার চাইলে সবকিছুই সম্ভব। রোকেয়ার মরদেহ আনার কথা ছিল। দেড় দশক আগে সরকারিভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই। প্রতিবছর রোকেয়া দিবসে প্রশাসনের কর্মকর্তারা রোকেয়ার দেহাবশেষ ভারত থেকে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোনো চিঠি চালাচালিও পর্যন্ত হয়নি। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ্দ মুরাদপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নারী জাগরণের অগ্রদূত, মহিয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি কলকাতায় মারা যান। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি অবশেষে যুক্ত হচ্ছে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। এর ফলে আঁধার কেটে প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরবে, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

